কুড়ানি's image
Share0 Bookmarks 24 Reads0 Likes

খড়খড়ি নদীর ধারে প্রতাপপুরে বিয়ে হয়ে সংসার করতে এসেছিলো ফেলানী। বাপের ঘর সাগরদিঘীতে আর ফিরে যাওয়া হয়নি তার। আসলে বিয়ে দেওয়ার নামে ঝাড়া হাত পা হয়েছিলো কাকা কাকিমা। সেই পাঁচ বছর বয়েস হবার আগেই যার বাপ-মা মরে হেজে যায়, তার কি আর বাপের ঘর বলে কিছু হয় ! তার ওপরে ফেলানী তো আবার বোকা হাবা। বাস কন্ডাক্টর গুলোও সে কথা জেনে গেছে। তাই কোলের মেয়ে ছানাটাকে কাঁখে করে বাসে উঠে রঘুনাথগঞ্জে যখন আসে মাঝে মধ্যে, ওরা দয়া করে ভাড়াটা আর নেয় না। অবশ্য ফেলানীর "ত" উচ্চারণ না করতে পারা ড ড করে কথা বলা নিয়ে মজা করতে তাই বলে ছাড়েনা।


ভগবান ই যখন তাঁর সৃষ্টিকে নিয়ে মজা করেছেন তখন অন্যরা ছাড়বে কেন ! পুষ্টির অভাবে ই কি না জানা নেই ফেলানী লম্বায় বেশি বাড়তে পারেনি। আপাত মোটা সোটা শরীরটা নিয়ে তখন হেলে দুলে চলে তখন তাকে দেখে তো লোকের হাসি পাওয়াটাই স্বাভাবিক। সেজন্যে ফেলানী কিছু মনে করেনা।


আগে অবশ্য এতোটা মোটা ও ছিলোনা। নুলো হারাধন কে বিয়ে করার পর ওদের সংসারে এসে প্রথম প্রথম শ্বাশুড়ি মা বেঁচে থাকাকালীন ধানসেদ্ধ , কাপড় কাঁচা, মাটির কোঠাবাড়ি লেপা সব কাজ করতে হলেও ভাতের অভাব ছিলনা। তরকারি, মাছ, মাংস, ডিম ছাড়া নুন-লঙ্কা দিয়েই ফেলানী যে একথালা ভাত খেয়ে নিতে পার তা বুঝেছিলেন বলে ,

উনি বরাবর একথালা ভর্তি ভাতের সাথে একটু ডাল দিতে ভুলতেন না। তবু তো বিয়ের পর পেট ভরে খেতে পেতো। তাই ফেলানী মাঝে মাঝে ভাবতো, "আগে যখন ছোটো ছিলাম টখন টো কাকিমার রেশনের মাপা খাবারই খেতে হোটো, কিন্তু এখন আমার শ্বাশুড়ি মায়ের ডরাজ হাট! আমাকে কট্ট

ভালোবাসেন! পেট ভট্টি করে খেটে ডেন।" সুখেই দিন কেটে যাচ্ছিল তার।


শ্বাশুড়ি-মা মারা যেতেই ঘটলো যত বিপত্তি! হারাধনের যেন একটা বছর অপেক্ষা করাও বড় ই কষ্ট। এই রকম বোকা বৌ দিয়ে সংসার চলেনা। মা যে কি জন্যে একে তার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন কে জানে!


তবে মুখে তার মধু ঝরে। মনে মনে যে আরেকটা বিয়ে করার ফন্দি আঁটছে হারাধন সেকথা টা পড়শীর মাধ্যমেই কানে আসে ফেলানীর।


আশ্চর্যের হলেও কথাটা সত্যি যে, দুঃখ হলেও নিজের স্বামীকেই সমর্থন করে ফেলানী। ওতো জানেই যে ও বোকা। বিয়েতে আপত্তি করার তো কোনো কারণ নেই। ওর শুধু একটু পেট ভরে খেতে পেলেই হলো।


যেমন মোষের মতো খাটতো, খেতোও তেমন গোগ্ৰাসে। সেটাই ওর সতীন লক্ষ্মীর চক্ষুশূল হলো। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অলক্ষ্মী বিদায় করেই ছাড়লো।


তারপর থেকেই তো দুয়ারে দুয়ারে ঘোরা শুরু। একটু পেট ভরে খাবার খাওয়ার জন্যে কত জনের কত আবদার ই তো সহ্য করতে হলো ! এভাবেই এই মেয়ে ছানাটাও একদিন কোলে এলো। না, কিছু মনে করেনি ফেলানী। মানুষ গুলান আদর সোহাগ যেমন করতো তেমন খেতেও তো দিতো!


কিন্তু এখন ফেলানীর দায়িত্ব বেড়ে গেছে অনেকটাই। মা হয়েছে যে ! ছানাকে তো আর উপোষ রাখতে পারেনা। তাই সপ্তাহে তিনদিন বাসে করে ওকে রঘুনাথগঞ্জে যেতেই হয়। নতুন নতুন অচেনা অথবা পুরোনো চেনা বাড়িতে হাত পাততেই হয়। কোনো একটা বাড়িতে হয়তো দুপুরে খেতেও দেয়।


আর যে কয়দিন বাড়িতে থাকে, ঝাড় জঞ্জাল জোগাড় করে ভিক্ষার অন্ন রাঁধতে হয়। মেয়ে ছানাটাকে তো আর উপোষ রাখতে পারেনা। প্রতাপপুর থেকে চলে যেতেও কেউ বলেনা ওকে।

হাটের পাশে একটা চালায় থাকে। অনেকেই মনে মনে মেয়ে ছানাটাকে নিজের মেয়ে বলে ভাবে। তাই মেতে বলতেও মায়া লাগে, ফেলানীর যদিও বুদ্ধি কম , তবুও বোঝে। ছানাটা উপোষ করলে ওর মতো বোধহয় ওদেরও কষ্ট হয় । হয়তো তাই মাঝে মধ্যে কেউ দু এক টাকাও দেয়। মেয়ে ছানাটাকে এখনও একদিনও উপোস করতে হয়নি। কিন্তু মানুষগুলান কেন যে ওর কোলের ছানাটা কে ডাকে কুড়ানি !



No posts

Comments

No posts

No posts

No posts

No posts